আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক গভীর ও গৌরবময় উদযাপনের সাক্ষী থাকল কলকাতা। গুয়াহাটি-ভিত্তিক ব্যতিক্রম গ্রুপ ও Meraki Associates-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ভাষা সংস্কৃতি মিলন উৎসব ২০২৬’ এর ২১তম সংস্করণ অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার ভিভান্তা কলকাতায়, ইএম বাইপাসে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যতিক্রম গ্রুপ এই ঐতিহাসিক দিনটি পালন করে আসছে ভাষাগত বৈচিত্র্য, বহুভাষিক সম্প্রীতি এবং মাতৃভাষা সংরক্ষণের অঙ্গীকার নিয়ে। এ বছরের উৎসবেও সাহিত্যিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধার্ঘ্য ও একুশে সম্মান প্রদান অনুষ্ঠান এক সুতোয় গাঁথা হয়ে এক অনন্য মাত্রা পায়। অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে বিশিষ্ট লেখক ও বৈদিক পণ্ডিত আচার্য শুভেন্দু সরকার-এর সাহিত্য ও চিন্তাধারাকে কেন্দ্র করে এক মননশীল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী প্রফেসর রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক প্রফেসর আশিস পাল, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক পলাশ চতুর্বেদী, রঘুনাথ আয়ুর্বেদ মহাবিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান সুকুমল মাইতি, সমাজকর্মী গুলাম আহমেদ প্রমুখ। নিজের বক্তব্যে আচার্য শুভেন্দু সরকার ভারতীয় সভ্যতার দার্শনিক গভীরতা এবং আধুনিক সমাজের সঙ্গে দেশজ জ্ঞানব্যবস্থার পুনঃসংযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। এই পর্বের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তাঁর গ্রন্থ “INDUS Knowledge of Life” “BHUMI The Sacred Land”-এর বই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান এবং সাহিত্যপ্রেমী ও গবেষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে ‘মিট দ্য অথর’ সেশন।
সন্ধ্যার প্রধান আকর্ষণ ছিল ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে সম্মান ২০২৬ প্রদান। এ বছর সম্মানপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন কবি ও সাহিত্যিক সুবোধ সরকার, সঙ্গীতশিল্পী ও অভিনেত্রী ইমন চক্রবর্তী, আবৃত্তিশিল্পী ও ‘ব্রততী পরম্পরা’-র প্রতিষ্ঠাতা ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়, লেখক আচার্য শুভেন্দু সরকার, লেখক ও Supreme Court of India-এর সিনিয়র কাউন্সেল প্রফেসর দীপক ভট্টাচার্য, Kolkata Press Club-এর সভাপতি স্নেহাশিস সুর, ISISAR-এর সচিব ও চিকিৎসক-লেখক ড. সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়, কবি ও প্রবন্ধকার প্রফেসর সুমন গুণ, সাংস্কৃতিক কর্মী ঋতচেতা গোস্বামী, সাংবাদিক ও সঙ্গীতশিল্পী শ্রাবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়, ফ্যাশন উদ্যোক্তা ও অসমের সোনালি মুগা পুনরুজ্জীবনের পথিকৃৎ সম্পা দাস এবং কলকাতার সমাজকর্মী পরিমল দে। সংবর্ধনা পর্বজুড়ে করতালি ও দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে ভাষা ও সংস্কৃতির এই সাধকদের প্রতি সম্মিলিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়।
সম্মান গ্রহণের পর ইমন চক্রবর্তী আবেগঘন কণ্ঠে কিংবদন্তি অসমীয়া শিল্পী জুবিন গার্গে-কে স্মরণ করেন এবং তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একুশে সম্মান উৎসর্গ করেন। কবি সুবোধ সরকার এই উদ্যোগকে অসম ও বাংলার মধ্যে ভাষা ও সাহিত্যের এক দৃঢ় সেতুবন্ধন হিসেবে অভিহিত করে ব্যতিক্রম গ্রুপের ভূয়সী প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড° সৌমেন ভারতীয়া বলেন, “একুশ বছর ধরে ভাষা সংস্কৃতি মিলন উৎসব প্রজন্ম, ভূগোল ও ভাষার মধ্যে সেতু রচনা করে চলেছে। বিশ্বায়নের এই সময়ে মাতৃভাষা রক্ষা করা আবেগ নয়, এটি আমাদের দায়িত্ব।”
