সময়ের তারতম্য: আইভিএফ ব্যর্থতায় ইমপ্লান্টেশনের সময় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) এখন শুধুমাত্র একটি পরীক্ষণাগার নির্ভর প্রক্রিয়া নয়, এটি হয়ে উঠেছে এক গভীরভাবে ব্যক্তিনির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি। তবু,  জিনগতভাবে সুস্থ ভ্রূণ ও নিখুঁত ট্রান্সফার হওয়া সত্ত্বেও কিছু  নিষিক্তকরণ চক্র কোনও এক অজানা কারণে সফল হয়ে ওঠে না। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেখাচ্ছে,  এর পেছনে থাকতে পারে এক লুকোনো কারণ, তা হল ইমপ্লান্টেশনের সময়সীমা। আগে যে সময়সীমাকে সকলের ক্ষেত্রে একই রকম ধরা হতো,  সেই ‘রিসেপ্টিভ উইন্ডো’ আসলে প্রতিটি নারীর ক্ষেত্রে আলাদা বলে জানিয়েছেন হাওড়ার বিড়লা ফার্টিলিটি অ্যান্ড আইভিএফ-এর ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট ড. সোনালি মণ্ডল বন্দ্যোপাধ্যায়।

ব্যর্থ চক্রের অদৃশ্য কারণসমূহ

সাধারণত,  ফ্রোজেন এমব্রিও ট্রান্সফার চক্রে প্রোজেস্টেরন শুরুর পাঁচ দিন পর ভ্রূণ স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রায় ২০–২৫ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে— বিশেষ করে যাঁদের পুনরাবৃত্ত ইমপ্লান্টেশন ব্যর্থতা (recurrent implantation failure)—র ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ঠিক সেই সময়কালে জরায়ুর ভিতরের আস্তরণ বা এন্ডোমেট্রিয়ামের স্তর গ্রহণক্ষম বা সক্রিয় থাকে না। অর্থাৎ,  ভ্রূণটি যতই নিখুঁত হোক না কেন,  জরায়ু যদি সেই মুহূর্তে ‘প্রস্তুত’ না থাকে,  তাহলে সংযুক্তি ঘটবে না। এই সূক্ষ্ম অমিল আল্ট্রাসাউন্ড বা হরমোন পরীক্ষায় ধরা যায় না। কিন্তু এটিকেই এখন আইভিএফ পদ্ধতির ব্যর্থতার অন্যতম লুকোনো কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

এন্ডোমেট্রিয়াল রিসেপ্টিভিটি টেস্টিং-এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

সাম্প্রতিক গবেষণা প্রমাণ করেছে, এন্ডোমেট্রিয়াল রিসেপ্টিভিটি টেস্টিং (ERT) জরায়ুর প্রকৃত রিসেপ্টিভ বা ভ্রূণ গ্রহণক্ষম সময় নির্ধারণে কার্যকর। অল্প পরিমাণ টিস্যুর বায়োপসি থেকে শত শত জিন এক্সপ্রেশন বিশ্লেষণ করে এই পরীক্ষা জানিয়ে দেয়, কখন জরায়ুর আস্তরণ ভ্রূণ গ্রহণে পুরোপুরি প্রস্তুত থাকবে। রিপ্রোডাক্টিভ বায়োলজি অ্যান্ড এন্ডোক্রিনোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, যেসব ক্ষেত্রে ভ্রূণের স্থানান্তর রিসেপ্টিভিটি পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে ও পরীক্ষালব্ধ ফলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়েছে,  সেখানে ইমপ্লান্টেশন ও গর্ভধারণের হার বেড়েছে। বিশেষ করে যে সব মহিলার ক্ষেত্রে অতীতে দুই বা ততোধিকবার চক্রটি ব্যর্থ হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতিতে সাফল্যের পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

ব্যক্তি-নির্দিষ্ট ভ্রূণ স্থানান্তর কৌশলের উত্থান

এই তথ্যের ভিত্তিতে এখন একটি নতুন কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে, তা হল পার্সোনালাইজড এমব্রিও ট্রান্সফার (pET) বা ব্যক্তি-নির্দিষ্ট ভ্রূণ স্থানান্তর। এখানে নির্দিষ্ট সময়সূচী অনুসরণ না করে,  প্রতিটি রোগীর নিজস্ব ‘ইমপ্লান্টেশন উইন্ডো’ অনুযায়ী ভ্রূণ স্থানান্তর করা হয়— যা প্রামাণ্য সময়ের চেয়ে আগে বা পরে হতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে,  এই পদ্ধতি বারবার ব্যর্থতায় ভোগা রোগীদের ইমপ্লান্টেশনের সাফল্য বাড়াতে পারে। এভাবে, ফার্টিলিটি কেয়ার তার প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে নির্ভুল,  ব্যক্তি-নির্দিষ্ট চিকিৎসায় রূপান্তরিত হয়েছে।

আরও বেশি ব্যক্তিনির্ভর আইভিএফ-এর পথে

প্রতিটি নারীর জরায়ু যে নিজস্ব সময়সূচী অনুযায়ী কাজ করে—এই উপলব্ধি আইভিএফ প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। আগে যেখানে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে কেবল ডিম্বাণু বা ভ্রূণের মানকে দায়ী করা হতো,  এখন চিকিৎসা বিজ্ঞান বুঝেছে— এন্ডোমেট্রিয়ামও একটি সক্রিয়, পরিবর্তনশীল অঙ্গ। রিসেপ্টিভিটি টেস্টিং-এর সহায়তায় ভ্রূণ স্থাপনের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা বর্তমানে ভ্রূণের সম্ভাবনা ও ইমপ্লান্টেশনের সাফল্যের মধ্যে ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠেছে। এ ভাবেই, প্রকৃতির নিখুঁত সমন্বয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান।

By Business Bureau