ভারতের ইন্স্যুরেন্স ইনফরমেশন ব্যুরো দ্বারা সংগৃহীত ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জীবন বীমা ব্যবসার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে যে, ভারতের আর্থিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান পলিসি হোল্ডাররা আরও বেশি কভারেজ বা বীমা সুরক্ষা বেছে নিয়ে নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তা সুদৃঢ় করছেন। জীবনের নানা পর্যায়ে মানুষের দায়িত্বও পরিবর্তিত হয়। বিষয়টি উপলব্ধি করে মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে নিজেদের বীমা কভারেজ বাড়িয়ে নিচ্ছেন। এই প্রবণতা থেকে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে জীবন বীমার প্রতি গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আস্থার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাশাপাশি, এটিও প্রমাণ করে যে জীবনের শুরুতে সুরক্ষা যাত্রা শুরু করা কতটা লাভজনক। আইআইবি-র বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে যে গত পাঁচ বছরে সমস্ত পলিসি বিভাগেই উচ্চমূল্যের জীবন বীমা কভারের দিকে ঝোঁক স্পষ্টভাবে বাড়ছে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২২ অর্থবর্ষের মধ্যে, উচ্চতর সাম অ্যাসিওরড বা বীমারাশির ক্যাটাগরিগুলি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পলিসিহোল্ডারদের মধ্যে উন্নত বীমা সুরক্ষা এবং উচ্চ কভারেজের দিকে একটি স্পষ্ট রূপান্তরকে প্রতিফলিত করে। ২ লক্ষ টাকা থেকে ৫ লক্ষ টাকার মধ্যে সাম অ্যাসিওরড থাকা পলিসির অংশীদারিত্ব ৫.৬ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ১০ লক্ষ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা ক্যাটাগরির পলিসি ২ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, উচ্চতর স্তরে, ৫০ লক্ষ টাকার বেশি সাম অ্যাসিওরড পলিসির সংখ্যা ২০২১-২২ অর্থবর্ষের ৪৪ লক্ষ থেকে ৬৮% বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ৭৪ লক্ষে পৌঁছেছে, যার বার্ষিক প্রিমিয়ামের পরিমাণ ৯৭,৫০০ কোটি টাকা।
এদিকে, ২০২১-২২ অর্থবর্ষে চালু থাকা সমস্ত জীবন বীমা পলিসির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশেরই (৬৫.১%) সমঅ্যাসিওরড ছিল ২ লক্ষ টাকা বা তার কম। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের মধ্যে এই অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ৫৩.৬%-এ নেমে এসেছে। এছাড়াও, একই সময়ের মধ্যে প্রতিটি উচ্চতর সমঅ্যাসিওরড ক্যাটাগরিতেই ক্রমাগত বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। এই তথ্য আরও ইঙ্গিত দেয় যে পলিসিহোল্ডাররা ক্রমাগত তাঁদের আর্থিক সুরক্ষার পেছনে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করছেন। গত পাঁচ বছরে চালু থাকা জীবন বীমা পলিসির মোট সংখ্যা প্রায় ৩৪.৩ কোটিতে মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও, প্রতি পলিসিতে গড় বার্ষিক প্রিমিয়াম ৪২.৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ২০২১-২২ অর্থবর্ষের ১৫,৫৬৭ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ২২,১৯৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই সমস্ত প্রবণতা থেকে বোঝায় যে, মানুষ জীবন বীমাকে কেবল এককালীন বা কর বাঁচানোর মাধ্যম হিসেবে না দেখে, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বীমা কভার আরও শক্তিশালী করে তুলছেন। ইনস্যুরেন্স অ্যাওয়ারনেস কমিটি লাইফ-এর চেয়ারপার্সন শ্রী কামলেশ রাও বলেছেন, “আইআইবি-র তথ্য থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, যেসব ভারতীয় জীবন বীমায় বিনিয়োগ করে আসছেন, তাঁরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করছেন এবং নিজেদের জীবন ও দায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বীমা কভারেজও জোরদার করছেন। এটা দেখে সত্যিই ভালো লাগছে যে পলিসিহোল্ডাররা নিজেদের এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়ে আরও বেশি সচেতন হয়ে উচ্চতর কভারের দিকে এগিয়ে চলেছেন। যাঁরা এখনও জীবন বীমা করাতে শুরু করেননি, তাঁদের জন্য সহজ বার্তাটি হলো যত জলদি শুরু করবেন, আর্থিক সুরক্ষা গড়ে তোলার জন্য তত বেশি সময় পাবেন, যা আপনার স্বপ্ন ও দায়িত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও শক্তিশালী হবে।”
উচ্চতর কভার এবং বেশি প্রিমিয়াম দেওয়ার এই প্রবণতার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। জীবন বীমার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বাড়তি আয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন ও দায়িত্ব বৃদ্ধির ফলে ব্যাপক সুরক্ষার চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোভিডের মহামারী ও তার পরবর্তী পরিস্থিতি মানুষের সুরক্ষার অভাবগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, যা মানুষকে তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা নতুন করে খতিয়ে দেখতে বাধ্য করেছে। একই সময়ে, বীমাকারীরা বিভিন্ন গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উপযোগী পলিসি নিয়ে এসেছে, ফলে জীবন বীমা আরও সহজলভ্য ও সময়োপযোগী হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় কথা, গ্রাহকরা জীবন বীমার আসল গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন। দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা এবং আর্থিক নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে এটি অন্যান্য বিনিয়োগের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। ঐতিহ্যবাহী অন্যান্য সঞ্চয় বা বিনিয়োগের মাধ্যম যেখানে সম্পদ তৈরিতে সাহায্য করে, অন্যদিকে জীবন বীমা একইসঙ্গে বাজারের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থেকে সুরক্ষা দেয়। ইনস্যুরেন্স অ্যাওয়ারনেস কমিটি – লাইফ জানিয়েছে যে এই প্রবণতাগুলো প্রমাণ করে জীবন বীমাকে এককালীন কোনও পণ্য হিসেবে না দেখে বরং জীবনের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সঙ্গী হিসেবে দেখা অত্যন্ত জরুরি। কম বয়সে শুরু করলে কম প্রিমিয়ামে সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় এবং ধীরে ধীরে আয়, দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের লক্ষ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কভারেজও বাড়ানো সম্ভব হয়। আইআইসি-লাইফ আরও বেশি করে ভারতীয়দের কম বয়সে জীবন বীমা শুরু করতে এবং পর্যাপ্ত ও যুগোপযোগী সুরক্ষার মাধ্যমে স্থায়ী আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করার জন্য আইআইবি গবেষণার ইনসাইট কাজে লাগিয়ে বিশেষ সচেতনতামূলক উদ্যোগ কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
ইনস্যুরেন্স অ্যাওয়ারনেস কমিটি–লাইফ ইনস্যুরেন্স সম্পর্কে:
ভারতের ৮৭ শতাংশ মানুষ এখনও জীবন বীমার ক্ষেত্রে একটি বড় সুরক্ষার ঘাটতির শিকার, যা দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই ঘাটতির পরিমাণ ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই বাড়তে থাকা ঝুঁকি পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে বিপন্ন করে তুলছে। আমাদের সমাজের আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি। এই সমস্যাটির সমাধানে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কাউন্সিলের ছত্রছায়ায় গঠিত হয়েছে ‘ইনস্যুরেন্স অ্যাওয়ারনেস কমিটি’। ২০১৯ সালে গঠিত এই কমিটিতে ২৫টি জীবন বীমা কোম্পানি একসঙ্গে মিলে কাজ করছে, যা নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মনোনীত ছয়জন সিইও-এর নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। এছাড়া ক্রিয়েটিভ ও মিডিয়া এজেন্সিগুলির সহায়তায় গঠিত একটি ক্রস-ইন্ডাস্ট্রি মার্কেটিং টিম এতে রয়েছে। ইনস্যুরেন্স অ্যাওয়ারনেস কমিটি জীবন বীমা পণ্য সম্পর্কে সচেতনতা, বোঝাপড়া এবং আগ্রহ বাড়াতে দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রচারণার গবেষণা, পরিকল্পনা, তৈরি ও পরিচালনা করে থাকে।
