তখন বড়পর্দায় উত্তমকুমার, সৌমিত্র ও শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্গে সন্ধ্যা রায়, অপর্ণা সেন, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়দের দাপট। সেই সোনালি সময়ে আচমকাই এক ঝলমলে, প্রাণোচ্ছল মুখ এসে জায়গা করে নিল দর্শকের মনে। তিনি অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায়। খুব দীর্ঘ অভিনয়জীবন নয়, ছবির সংখ্যাও অগুনতি নয়। অথচ কয়েকটি চরিত্র, কয়েকটি ছবি আর তাঁর নিজস্ব পর্দা-আবেদন— সব মিলিয়ে খুব অল্প সময়েই সেই সময়কার দর্শক থেকে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল, সকলেরই নজর কেড়েছিলেন তিনি
সিনেমায় তাঁর অভিষেকও যেন সেই সময়ের বাংলা ছবির এক আলাদা অধ্যায়ের শুরু। চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ (১৯৭২) ছবিতে অভিনয়জীবনের সূচনা। নায়ক শমিত ভঞ্জ। তখন মিঠুর বয়স মাত্র ১৭। তার পর ধীরে ধীরে পর্দার জগতে পরিচিতি বাড়তে শুরু করে বেহালার অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়েটির। পরের বছরেই দীনেন গুপ্তের ‘মর্জিনা আবদুল্লা’-এ দেবরাজ রায়ের সঙ্গে জুটি। বক্সঅফিসে রাতারাতি হিট। মিঠুর রূপ থেকে শুরু করে নাচ ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ে মুগ্ধ দর্শক। সেই বছরেই মুক্তি পেল ‘নিশিকন্যা’, আবার সাফল্য। ১৯৭৪ সালে উত্তম-সাবিত্রী ও রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘মৌচাক’। রঞ্জিতের অভিনীত লাজুক যুবক সীতেশের বেপরোয়া প্রেমিকা মিঠুর ‘নীপা’! আবার সুপারহিট! একের পর এক চরিত্র তাঁকে পৌঁছে দেয় আরও বড় দর্শকবৃত্তের কাছে। আর ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের দাপটে নায়িকা-পরিচয়ের ভিত আরও মজবুত হয় তাঁর।
মৌচাক’-এর নীপাকে কি সহজে ভোলা যায়? এক ঝাঁক তারকার উপস্থিতির মধ্যেও একাধারে বেপরোয়া ও সপ্রতিভ প্রেমিকার চরিত্রে মিঠুর সহজ ও সাবলীল অভিনয় আলাদা করে চোখে পড়েছিল। তাঁর সৌন্দর্য ছিল নজরকাড়া, কিন্তু ক্যামেরার সামনে শুধু সুন্দর মুখ হয়ে থাকেননি তিনি। চোখেমুখের অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার স্বাভাবিকতা, পরিস্থিতির সঙ্গে চরিত্রকে মিশিয়ে দেওয়ার সহজাত ক্ষমতা— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল মিঠুর নিজস্ব পর্দা-ব্যক্তিত্ব। এখনও মিঠুর কথা ভাবলেই অনিবার্য ভাবে ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’ গানটির সঙ্গে সদ্য প্রেমে পড়া নীপার লাজুক মুখটি মনে পড়ে সেই সময়কার দর্শকের।
‘মর্জিনা আবদুল্লা’ মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে, মৌচাক’-এর আগে। আরব্য রজনীর আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের সেই গল্পের রোমাঞ্চের আধারে বানানো চিত্রনাট্যে মর্জিনা চরিত্রে মিঠুর অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর নাচ ছিল আলাদা আকর্ষণ। একটি দৃশ্যে ছুরি হাতে দস্যদলের সামনে মিঠুর সেই বিখ্যাত নাচ আর লিপে লতা মঙ্গেশকরের গান ‘হায় হায় প্রাণ যায় যায় প্রাণ যায়..’। অসাধারণ উন্মাদনা তৈরি করেছিল দর্শকমনে। ওই ছবিতেই ‘মার ঝাড়ু মার’ গানটির সঙ্গে মিঠুর নাচও দুর্দান্ত সফল!
